প্রথম পর্ব: শিবানী
প্রথম পর্ব: শিবানী বৈশাখের শেষ বিকেল। গ্রামের পুব পাড়ার বাঁশবন থেকে ছায়া লম্বা হয়ে এসে পড়েছে শিবানীদের উঠোনে। আকাশের বুকে ছড়িয়ে পড়েছে রাঙা সাঁ...
বৈশাখের শেষ বিকেল। গ্রামের পুব পাড়ার বাঁশবন থেকে ছায়া লম্বা হয়ে এসে পড়েছে শিবানীদের উঠোনে। আকাশের বুকে ছড়িয়ে পড়েছে রাঙা সাঁঝের আলো, আর হালকা বাতাসে উঠোনের আমগাছের পাতাগুলো সোনা-রঙে ম্লান হয়ে উঠেছে। শিবানী ঘরের কোণে বসে, মন-মরা হয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে। তার চোখে একরকমের অদ্ভুত নীরবতা, যা দেখে বোঝা যায় সে তার নিজের বেদনা নিয়ে কতটা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।
শিবানী ছিল দুই ভাই আর দুই বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। তার বাবা শচীন, এক সময় গ্রামের স্কুলে মাস্টার ছিলেন। নিজের কর্তৃত্ব আর আদর্শের জন্য সবার কাছে তিনি সম্মানিত ছিলেন। শচীনদেব কে সবাই সম্মান করত, ভালোবাসত। কিন্তু সময়ের ধারায় সেই শিবানী মায়ের এক বড় অসুখ করে তার পিছনে প্রায় সব টাকাই শেষ, এখন যা আছে তা শুধু পরিবারের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট।এক বার শিবানী মা বলেছিল ওরে আমার পিছনে টাকা না ঢেলে বিষ এনে দে।এতে আমিও বাঁচি তোরাও বাচিস
শিবানী মায়ের মুখের উপর হাত দিয়ে বলেছিল আর কখনো ও কথা বলো না তুমি আছো তাই আমরা আছি তোমাকে ছাড়া কেমনে থাকব।
শচীনবাবুর বড় মেয়ে মৃণালিনী, যাকে শিবানী স্নেহ আর সমীহের চোখে দেখত, বিয়ে করেছিলেন এমন একজন পুরুষকে যে প্রথম দেখাতেই নিজের ক্ষমতা আর বিত্তের অহংকারে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। মৃণালিনীর সেই স্বামী, চঞ্চল, তার স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার চেয়ে তার নিজের সামাজিক মর্যাদা নিয়ে বেশি ব্যস্ত ছিল। মৃণালিনীর জীবনে সেই মানুষটি নিয়ে আসে একরকমের নিঃসঙ্গতা, একাকিত্ব। শিবানী বুঝতে পারত, তার বোনের মুখে হাসি নেই, তার চোখে চাপা অশ্রুর ছায়া আছে।
শিবানীর দুই ভাই। বড় ভাই অনিল, যিনি এখনো বাড়ির সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। আর মেজো ভাই জিতেন, যে কাজের খোঁজে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। শচীনবাবু আর তার স্ত্রী সারাদিন শুধু তাদের ছেলেদের নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন, বিশেষত অনিলের জন্য, যাকে তারা একদিন খুব ভালো ঘরে বিয়ে দিতে চান।
বাড়ির এই অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে শিবানীর বিয়ে ঠিক হয় নরেন্দ্রর সাথে। নরেন্দ্রর পরিবার মোটামুটি গরিব, তারা বড়লোকদের মতো দেখতে না হলেও তাদের মনে গ্রাম্য সাদাসিধে ভাবনা ও সংস্কার। নরেন্দ্র গায়ে লম্বা, সুদর্শন, আর গায়ের রং শ্বেত শুভ্র। প্রথম দেখায় তার সাদা রঙের দীপ্তি এবং শান্ত স্বভাব শিবানীর মনে একরকমের আশা জাগিয়ে তুলেছিল, যেন সে জীবনে একটু সুখের সন্ধান পেতে চলেছে।
বিয়ের দিন নরেন্দ্রের পরিবার শিবানীর বাবা-মাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যে তারা শিবানীকে একটা সোনার অলংকার উপহার দেবে। কিন্তু তারা বলেছিল যে কিছুটা সময় লাগবে সেটা দিতে। শচীনবাবু তা নিয়ে খুব একটা চিন্তিত হননি, বরং তিনি ভাবলেন, তাদের মতো একটা সরল পরিবার এত বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সেটাই অনেক।
বিয়ের পর শিবানীর জন্য শুরু হলো এক নতুন জীবন, কিন্তু সেই জীবনের শুরুতেই সে বুঝতে পারল, নরেন্দ্র যেন এক অন্য মানুষ। তার মিষ্টি কথার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক কঠোরতা, যা প্রতিদিন শিবানীর আত্মবিশ্বাসকে ভেঙে দিতে লাগল। শিবানীর গায়ের রং কালো হওয়ার জন্য, নরেন্দ্র প্রায়ই তার রূপ নিয়ে কটাক্ষ করত। নরেন্দ্রের সেই কঠোর কথা শিবানীর হৃদয়ে যেন প্রতিদিন বিষ ঢেলে দিত।
প্রতিদিনের সংসারে নরেন্দ্র শিবানীর সঙ্গে নানা ধরনের তুলনা করতে থাকে, তার গায়ের রং, তার চলাফেরা, এমনকি তার গ্রামের পটভূমি নিয়েও। শিবানী চুপচাপ শুনে যেত, কারণ তার মনে তখন শুধুই একরকমের লজ্জা আর অপমানের অনুভূতি। নরেন্দ্রের কথা যেন তার আত্মাকে ক্ষতবিক্ষত করে তুলছিল, কিন্তু সে তা প্রকাশ করত না।
তার জীবনের এই নতুন পরিস্থিতিতে শিবানী বুঝতে পারে, তার সুখ যেন এক মরীচিকা। সে যে একদিন নরেন্দ্রকে ভালোবাসার আশায়, নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখেছিল, সেই স্বপ্ন আজ বাস্তবতার আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। তার প্রতিটি নিশ্বাসে যেন একরকমের ব্যথা, এক অচেনা যন্ত্রণার অনুভূতি ধরা পড়ে।
শিবানী যখন তার ছোটবেলার দিনগুলোর কথা ভাবে, তখন তার মন কাঁদতে থাকে। বাবার বাড়ির স্নেহময় ভালোবাসা, বড় বোনের হাসি, আর ভাইদের সঙ্গে কাটানো আনন্দময় দিনগুলো - সবই যেন আজ এক বিষণ্ন স্মৃতির রূপ নিয়েছে। তার মনে হয়, যে বাড়িতে সে একদিন এত সুখী ছিল, সেই বাড়ি আজ তার থেকে কত দূরে।
নরেন্দ্রের এই অহংকার, তার গায়ের রঙের প্রতি আক্রোশ, আর শিবানীর নিঃশব্দ বেদনাময় সহ্য - এই তিনটি বিষয়ের মধ্যে প্রতিদিনের সংসার জীবন যেন এক তীব্র মানসিক যন্ত্রণার রূপ নিচ্ছে। শিবানীর মনে তখন একটাই প্রশ্ন জাগে, এই সংসার কি তাকে কখনো শান্তি দিতে পারবে? নাকি তার জীবন এভাবেই চিরকাল কষ্টের ঘূর্ণিতে ঘুরবে?
About the Author

Sourav Halder
Sourav Halder is a writer and web developer focused on building modern, scalable digital platforms. He works with technologies like MediaWiki, WordPress, and the MERN stack to create powerful websites, automation tools, and knowledge platforms. Alongside development, he writes articles and analyses that explore technology, media, and society.
Related Stories
উপন্যাস: টেলিফোন
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে, আকাশ মেঘলা। মনে হচ্ছে, বৃষ্টি নামবে। এই বৃষ্টি যেন আমার মন থেকে সমস্ত দুংখ ধুয়ে এক শীতল পরশ ফেলে দেবে। আমি খাট থেকে উঠে চেয়া...
উপন্যাস: টেলিফোন
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে, আকাশ মেঘলা। মনে হচ্ছে, বৃষ্টি নামবে। এই বৃষ্টি যেন আমার মন থেকে সমস্ত দুংখ ধুয়ে এক শীতল পরশ ফেলে দেবে। আমি খাট থেকে উঠে চেয়ারে...
বোধ
বোধ (প্রবন্ধ) সৌরভ হালদার "জীবন যেন এক বিরাট প্রহেলিকা, যার প্রতিটি ধাপে লুকিয়ে থাকে গভীর অন্তর্দৃষ্টি।" এই পৃথিবীর বুকে প্রতিটি মানুষ এক একটি গল্...