travel
সুন্দরবনে আমাদের হারিয়ে যাওয়া মুহূর্ত
অনেক দিন ধরে মন চাইছিল বন্ধুদের নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাই। শহরের কোলাহল আর ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি দূর করার জন্য প্রকৃতির মাঝে ডুবে যাওয়ার চেয়ে ভালো আর ক...
By sourav • 2024-12-17
অনেক দিন ধরে মন চাইছিল বন্ধুদের নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাই। শহরের কোলাহল আর ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি দূর করার জন্য প্রকৃতির মাঝে ডুবে যাওয়ার চেয়ে ভালো আর কিছু হতে পারে না। আমার বন্ধু আনিস, আব্দুল্লাহ এবং আরও কয়েকজন— নাঈম, ফাহিম, রুহি ,ফারুক, জয়ন্ত, শরিফও তার ছোট ভাই আর আমাদের বড় ভাই মিলনদাসহ আরো বেশ কয়েকজন মিলে ঠিক হল আমরা সুন্দরবনে ঘুরতে যাব।

যাত্রার দিনটি ছিল রবিবার। ভোর পাঁচটায় সবাই মিলে একটি ট্রলার ভাড়া করে রওনা দিলাম খুলনা দৌলতপুরের ভৈরব নদী থেকে, ট্রলারে চেপে আমাদের যাত্রা শুরু। ভোরের ঠান্ডা বাতাস আর কুয়াশা মুড়ে থাকা নদী যেন আমাদের যাত্রাকে আরও রোমাঞ্চকর করে তুলেছিল। কুয়াশায় ঢাকা প্রকৃতি যেন এক অলৌকিক দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে। শীতের রেশ তখনো মিলিয়ে যায়নি। ট্রলার চলতে চলতে প্রকৃতির রূপ বদলাতে থাকে। কুয়াশা কেটে যায়, আকাশে দেখা যায় রোদের আলো । আনিস ছিল আমাদের দলের প্রাণ। পুরো রাস্তায় তার হাসি-ঠাট্টা, গল্প আর গান আমাদের ক্লান্ত হতে দেয়নি।

আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল মংলা। সেখানে পৌঁছাতে আমাদের প্রায় চার ঘণ্টা লেগে গেল। সকালের নাস্তা করলাম ট্রলারে ভিতরে। কলা কেক খেয়ে আমরা তৈরি হলাম বনের পথে। নাস্তার পর ট্রলারে মনে হচ্ছিল আমরা যেন এক অজানা রোমাঞ্চের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। নদীর মাঝখানে এসে চারপাশে তাকিয়ে মনে হলো, আমরা প্রকৃতির এক বিশাল অরণ্যের মাঝখানে এসে পড়েছি। দূরে ম্যানগ্রোভ গাছের সারি আর নদীর জল আমাদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছিল। সুন্দরবনে ভ্রমণের প্রথম ধাপই হলো বনের ভেতর ঘুরে দেখা। করমজলে নেমে ফরেস্ট কার্ডের সাথে দেখা সেখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল বিভিন্ন নিয়ম কানুন, সুন্দরবনের বিভিন্ন অংশ ঘুরতে হলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম মানতে হবে। প্রথমত, কোনওভাবেই বনের প্রাণীদের বিরক্ত করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, জঙ্গলের ভেতরে কখনো দল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া যাবে না। নদীর পানির শব্দ, গাছের পাতা নড়ার মৃদু আওয়াজ আর পাখির ডাক মিলে এক অদ্ভুত পরিবেশ তৈরি করেছিল। আনিস তার ক্যামেরা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। সে নদীর পানিতে মাছ ধরার চিত্র, ম্যানগ্রোভের শিকড় আর আকাশে উড়ন্ত পাখির ছবি তুলছিল।
[caption id="attachment_1565" align="alignnone" width="225"]

oplus_33[/caption]
সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো রয়েল বেঙ্গল টাইগার। তবে, এদের দেখা পাওয়া বেশ কঠিন।" আমাদের সবার মনেই উত্তেজনা কাজ করছিল।আমরা যখন রেলিং দিয়ে হেঁটে চলছিলাম তখন ফয়সাল বলল, "ওই দেখ, বাঘের পদচিহ্ন!" আমরা সবাই পাশে ঝুঁকে পড়লাম। সত্যিই, বালুর মধ্যে বাঘের বড় বড় পায়ের ছাপ দেখা যাচ্ছিল।
আমাদের সবার মনই খুশিতে ভরে উঠল, যদিও বাঘের সরাসরি দেখা পাওয়া সম্ভব হয়নি।আমাদের পাস থেকে একজন যেতে যেতে জানালেন, "বাঘ খুব লাজুক প্রকৃতির। তবে, এরা সবসময় আপনাদের দেখছে, এমনকি যদি আপনারা এদের না দেখেন।" কথাটা শুনে সবার মেরুদণ্ড দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল।
[caption id="attachment_1566" align="alignnone" width="300"]

oplus_1024[/caption]
জঙ্গলের একটু গভীরে প্রবেশ করেই হঠাৎই দূরে এক ঝাঁক হরিণ দেখতে পেলাম। ওরা খুব সাবধানে ঘাস খাচ্ছিল।নাঈম আনন্দে চিৎকার করে উঠল, "ওই দেখো হরিণ!" এরপর একটু দূরেই বিশাল একটি কুমিরকে রোদ পোহাতে দেখলাম। কুমিরটি বড় বড় দাঁত বের করে হাঁ করে শুয়ে ছিল। জয়ন্ত তার ক্যামেরায় মুহূর্তটি বন্দি করল। আমরা সুন্দরবনের গহীন জঙ্গল এবং বানরদের চিৎকার এর পাশাপাশি সেখানে একটি টাওয়ার ছিল যার উপর থেকে বিশাল বড় জঙ্গল আমরা উপভোগ করতে লাগলাম এবং অনেকে আন্তরিকতার সহিত এই সময়টাকে ক্যামেরায় বন্দি করতে লাগলো সকাল গড়িয়ে এখন
বিকেলের দিকে আমাদের ট্রলারে ফিরে আসার জন্য রওনা দিল। সূর্য ধীরে ধীরে অস্ত যেতে শুরু করল। নদীর জলে সূর্যের প্রতিফলন দেখে মনে হচ্ছিল প্রকৃতি যেন তার রঙের প্যালেট নিয়ে খেলছে।
ফিরে আসার পথে আমরা সবাই বেশ চুপচাপ ছিলাম। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতির এত সুন্দর জায়গা থেকে দূরে চলে যাচ্ছি। কিন্তু একসাথে কাটানো মুহূর্তগুলো, সুন্দরবনের নৈসর্গিক সৌন্দর্য আর সেখানে কাটানো সময় আমাদের স্মৃতির অমূল্য অংশ হয়ে থাকবে।
এই ভ্রমণ আমাদের জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। সুন্দরবনের প্রকৃতি, তার বন্যজীবন আর মানুষের সহজ-সরল জীবনযাত্রা আমাদের মনকে ছুঁয়ে গেছে। এই ভ্রমণ আমাদের শিখিয়েছে, প্রকৃতি আমাদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং একে রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব।
"সুন্দরবন, তুমি চিরকাল আমাদের হৃদয়ে থাকবে।"
সৌরভ হালদার